বাংলা সাহিত্যের দিগন্তে নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭–১৯০৯) এক স্মরণীয় নাম। উনিশ শতকের শেষভাগে মাইকেল মধুসূদন দত্তের পর যিনি বাংলা মহাকাব্যের ধারাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি নবীনচন্দ্র। তাঁর বিখ্যাত ত্রয়ী মহাকাব্য—**'রৈবতক' (১৮৮৭), 'কুরুক্ষেত্র' (১৮৯৩) এবং 'প্রভাস' (১৯৯৬)**—এর মধ্যে প্রথম এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো 'রৈবতক'।
আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব, একটি আদর্শ মহাকাব্যের আঙিনায় দাঁড়িয়ে নবীনচন্দ্র সেনের **'রৈবতক'** কাব্যটি কতখানি সার্থক এবং কেন একে বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য বলা হয়।
মহাকাব্য কী? (The Epic Tradition)
'রৈবতক' কাব্যের সার্থকতা বিচার করার আগে আমাদের সংক্ষেপে জেনে নেওয়া দরকার মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য কী। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব (বিশেষ করে অলঙ্কার শাস্ত্র ও অ্যারিস্টটলের পোয়েটিক্স) অনুযায়ী, একটি আদর্শ মহাকাব্যের কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ থাকে:
* **উন্নত ও গম্ভীর বিষয়বস্তু:** এর পটভূমি হবে বিশাল এবং ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক কোনো মহান ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
* **মহৎ নায়ক:** মহাকাব্যের নায়ক হবেন ধীরোদাত্ত গুণসম্পন্ন, কোনো দেববংশীয় বা অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।
* **সর্গবিভাগ:** কাব্যটি কয়েকটি সর্গে বা অধ্যায়ে বিভক্ত থাকবে।
* **রস সঞ্চার:** বীর, করুণ বা শান্ত রসের যেকোনো একটি হবে প্রধান রস, বাকিগুলো হবে তার সহযোগী।
* **উন্নত শৈলী ও ছন্দ:** এর ভাষা হবে গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং ছন্দ হবে প্রবাহমান (যেমন অমিত্রাক্ষর ছন্দ)।
রৈবতক' কাব্যের পটভূমি ও মূল ভাবনা
নবীনচন্দ্র সেন 'রৈবতক' কাব্যে মহাভারতের চেনা আখ্যানকে এক সম্পূর্ণ নতুন ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্নির্মাণ করেছেন। এখানে অর্জুনের সুভদ্রা হরণ এবং রৈবতক পাহাড়ে (বর্তমান গিরনার পর্বত) যদুবংশের উৎসবকে কেন্দ্র করে কাহিনীর সূত্রপাত হলেও, কবির মূল উদ্দেশ্য ছিল অন্য।
কবি এখানে শ্রীকৃষ্ণকে কোনো অলৌকিক দেবতা হিসেবে নয়, বরং একজন **আদর্শ মানব, সমাজ-সংস্কারক এবং রাজনৈতিক দূরদর্শী নেতা** হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কৃষ্ণের লক্ষ্য ছিল জরাজীর্ণ, ব্রাহ্মণ-শাসিত ও খণ্ড-বিখণ্ড ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি প্রীতি-ভিত্তিক, বৈষম্যহীন 'মহাভারত' বা অখণ্ড ভারত সাম্রাজ্য গড়ে তোলা।
মহাকাব্য হিসেবে 'রৈবতক'-এর সার্থকতা বিচার
একটি মহাকাব্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করলে 'রৈবতক'-এর সার্থকতা নিম্নলিখিত দিকগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
১. বিশাল পটভূমি ও জাতীয় চেতনা
মহাকাব্যের প্রথম শর্তই হলো বিষয়ের বিশালতা। 'রৈবতক' কাব্যে কবির ক্যানভাস অত্যন্ত বিস্তীর্ণ। আর্য-অনআর্য সংঘাত, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের ক্ষমতার লড়াই, এবং জরাজীর্ণ সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার পটভূমিতে এই কাব্য রচিত। তৎকালীন পরাধীন ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে নবীনচন্দ্র এই কাব্যের মাধ্যমে একটি **ঐক্যবদ্ধ, স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক ভারতের স্বপ্ন** দেখেছিলেন, যা একে 'জাতীয় মহাকাব্যের' মর্যাদা দেয়।
২. ধীরোদাত্ত ও যুগান্তকারী নায়ক
'রৈবতক'-এর প্রধান চালিকাশক্তি হলেন শ্রীকৃষ্ণ। অলৌকিকতার খোলস ছেড়ে তিনি এখানে এক মহান রাজনৈতিক দূরদর্শী পুরুষ। তিনি একদিকে অস্ত্রধারী খলনায়কদের (যেমন জরাসন্ধ, শিশুপাল) অত্যাচার থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করতে চান, অন্যদিকে আর্য ও অনার্য (যেমন বাসুকি ও জরৎকারু) জাতির মধ্যে প্রীতির বন্ধন গড়ে তুলতে চান। কৃষ্ণের এই মহৎ ও গম্ভীর চরিত্রটি মহাকাব্যের নায়কোচিত গুণকে পুরোপুরি সার্থক করেছে।
৩. মহাকাব্যিক সংঘাত (Epic Conflict)
দ্বন্দ্ব বা সংঘাত ছাড়া মহাকাব্য জমে ওঠে না। 'রৈবতক'-এ এই সংঘাত দ্বিমুখী:
* **বাহ্যিক সংঘাত:** কৃষ্ণ ও অর্জুনের সঙ্গে জরাসন্ধ বা দুর্যোধনদের রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই।
* **আদর্শগত সংঘাত:** একদিকে দুর্বাসা ও পরশুরামের প্রতিনিধিত্বে প্রাচীন, রক্ষণশীল ও নিষ্ঠুর ধর্মব্যবস্থা; অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণের প্রীতি, প্রেম ও সাম্যের নতুন ধর্ম। এই আদর্শিক লড়াই কাব্যটিকে এক গভীর দার্শনিক উচ্চতা দিয়েছে।
৪. সর্গবিন্যাস ও আখ্যানের বিস্তার
'রৈবতক' কাব্যটি মোট **বিংশতি (২০টি) সর্গে** বিভক্ত। মহাকাব্যের নিয়ম মেনে এতে যুদ্ধ, উৎসব, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য (যেমন রৈবতক পাহাড়ের বর্ণনা, সূর্যাস্ত, সমুদ্রের রূপ) এবং মানবীয় আবেগের চমৎকার ভারসাম্য রয়েছে। ঘটনার পর ঘটনা যেভাবে আবর্তিত হয়েছে, তা পাঠককে এক বিশাল মহাকাব্যিক যাত্রার অনুভূতি দেয়।
৫. রস ও শৈলী বিচার
এই কাব্যের প্রধান রস হলো **বীর রস** এবং **ভক্তি রস**। তবে এর পাশাপাশি অর্জুন-সুভদ্রার প্রণয়লীলায় শৃঙ্গার রস এবং অনার্যদের ট্র্যাজেডিতে করুণ রসেরও চমৎকার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো নবীনচন্দ্রও অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার করেছেন। তাঁর ভাষা গম্ভীর, ওজস্বী এবং উপমা-উৎপ্রেক্ষায় সমৃদ্ধ, যা মহাকাব্যের গাম্ভীর্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
কিছু সীমাবদ্ধতা: যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না
মহাকাব্য হিসেবে অত্যন্ত সফল হলেও, সমালোচকরা 'রৈবতক'-এর কিছু দুর্বলতাও চিহ্নিত করেছেন:
* **গীতিকাব্যের আধিক্য:** নবীনচন্দ্র মূলত ছিলেন স্বভাব-গীতিকবি (Lyric Poet)। তাই বহু জায়গায় মহাকাব্যের মহিমান্বিত গাম্ভীর্য ছাপিয়ে কবির নিজস্ব আবেগ ও গীতিকবিতার সুললিত সুর বেশি প্রকাশ পেয়ে গেছে।
* **অতিরিক্ত বক্তৃতাধর্মিতা:** শ্রীকৃষ্ণ বা অন্যান্য চরিত্রগুলোর দীর্ঘ সংলাপ বা রাজনৈতিক-ধর্মীয় বক্তৃতা অনেক সময় কাহিনীর গতিকে কিছুটা মন্থর করে দিয়েছে।
উপসংহার: রৈবতক কি শেষ পর্যন্ত সার্থক?
"মহাকাব্যের বহিরাঙ্গ অপেক্ষা তার অন্তরাত্মা বা মহৎ উদ্দেশ্যের দিক থেকেই 'রৈবতক' বেশি সার্থক।"
সব দেশ ও সব কালের মহাকাব্যের একটাই মূল কথা—তা হলো মহৎ আদর্শের জয়গান। নবীনচন্দ্র সেনের 'রৈবতক' সেই কষ্টিপাথরে ১০০ তে ১০০ পাবে। তিনি প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনীর আধুনিক রূপান্তর ঘটিয়ে নিজের সমকালকে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। খণ্ড-বিচ্ছিন্ন ভারতকে একতার সূত্রে বাঁধার যে মহৎ বার্তা এই কাব্যে দেওয়া হয়েছে, তা আজও প্রাসঙ্গিক।
তাই কিছু গাঠনিক বা ছন্দগত ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, বিষয়বস্তুর বিশালতা, চরিত্রের মহত্ব এবং জাতীয় ভাবাদর্শের দিক থেকে **'রৈবতক' বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত সফল এবং সার্থক মহাকাব্য**।
*আপনার কি এই ব্লগের কোনো নির্দিষ্ট অংশ (যেমন কৃষ্ণের চরিত্র বা অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার) আরও বিস্তারিত জানার প্রয়োজন আছে? কমেন্টে জানান!*
